জিয়াউর রহমান

লেফটেন্যান্ট জেনারেল শহীদ জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কিংবদন্তির নাম।
তিনি ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, একজন মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সেনানায়ক, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক, উন্নয়নমুখী নেতৃত্বের প্রতীক এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং জাতীয় পুনর্গঠনের প্রতীক হয়ে আছে। তিনি জাতিকে আত্মবিশ্বাস শিখিয়েছিলেন, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অরাজকতা থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার পথে এগিয়ে যায়।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশের বগুড়া জেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামের মণ্ডল বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরের রসায়নবিদ, এবং মা জাহানারা খাতুন (ওরফে রানী) ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়, আর পারিবারিক আবহে তাঁর ডাকনাম ছিল “কমল”।

শহীদ জিয়াউর রহমানের বংশোদ্ভূত পরিবার ছিল বগুড়ার মহিষাবান গ্রামের প্রাচীন ও সম্মানিত মণ্ডল পরিবার। তাঁর দাদা মৌলবি কামালুদ্দীন মণ্ডল (জন্ম ১৮৫৪) ছিলেন এক শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব, যিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিলেন গাবতলী ও যমুনার পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলের প্রখ্যাত নেতা মুমিন উদ্দিন মণ্ডল এব তাঁর উত্তরসূরি কাঁকর মণ্ডল সাহেব। এই পরিবার সামাজিক নেতৃত্ব, শিক্ষা ও নৈতিক আদর্শে সুপরিচিত ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই জিয়াউর রহমান একটি দেশপ্রেমিক, ধর্মপ্রাণ ও পরিশ্রমী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

তাঁর শৈশবের একাংশ কেটেছে বগুড়ার শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে, আর পরবর্তীতে কলকাতায়। পিতার চাকরির সুবাদে পরিবার কলকাতায় অবস্থান করলে জিয়াউর রহমান বিখ্যাত হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। শৈশবেই তিনি ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ, আত্মনির্ভরশীল এবং কৌতূহলী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল কঠোর মনোবল ও দায়িত্ববোধ।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর তাঁর পরিবার কলকাতা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি নগরীতে চলে যান। সেখানে জিয়াউর রহমান নতুন পরিবেশে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নেন। তিনি ভর্তি হন করাচি একাডেমি স্কুলে, এবং ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরের বছর ভর্তি হন করাচির ডি.জে. কলেজে।

১৯৫৩ সালেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তরুণ জিয়া নিজের মধ্যে দেশের জন্য কিছু করার অদম্য বাসন অনুভব করেন। দৃঢ় সংকল্প ও আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুলে যোগ দেন। এখানেই শুরু হয় তাঁর সামরিক জীবনের প্রথম অধ্যায় যা পরবর্তীতে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, স্বাধীনতার ঘোষক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে অমর করে তোলে।

সামরিক জীবনের সূচনা

১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। দুই বছর পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন এবং শীঘ্রই তাঁর দক্ষতা, শৃঙ্খলাবোধ ও নেতৃত্বগুণে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশংসা অর্জন করেন।

১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তিনি অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন; তাঁর অধীনে সৈন্যরা সেই যুদ্ধে সর্বাধিক বীরত্ব পদক অর্জন করে। তাঁর এ বীরত্বই ছিল ভবিষ্যতের মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার আগাম বার্তা।

পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কোয়েটার স্টাফ কলেজে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানিতে সামরিক কোর্স সম্পন্ন করে দেশে ফিরে চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী“অপারেশন সার্চলাইট”নামে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে। সেদিন থেকেই বাংলার ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অবস্থানরত মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহের ডাক দেন।

২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ঘোষণা করেন—

“আমি বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক মেজর জিয়া এতদ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”

এই ঘোষণাই প্রমবারের মতো বিশ্বকে জানিয়ে দেয় বাংলাদেশ নামের একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি মুক্তিবাহিনীর সেক্টর-১ এবং পরে সেক্টর-১১ এর নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তিনি গঠন করেন “জেড ফোর্স”, যা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাফল্য অর্জন করে।

যুদ্ধ শেষে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব পদক “বীর উত্তম” প্রদান করা হয়।

স্বাধীনতার পর সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক

স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমান দ্রুত উত্থান লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ, ১৯৭৩ সালে ব্রিগেডিয়ার এবং পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক সিপাহী জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান কার্যত দেশের নেতৃত্বে আসেন। পরে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান: সংস্কার ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” যুক্ত করেন এবং রাষ্ট্রের মূলনীতিতে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস” সংযোজন করেন।

তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) — “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” দর্শনের ভিত্তিতে।

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে বিজয়ী হয় — যা তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের গভীর আস্থার প্রতিফলন।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার

তিনি প্রাইভেট সেক্টর পুনরুজ্জীবিত করেন, কৃষিতে ভর্তুকি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন এবং “১৯ দফা কর্মসূচী” ঘোষণা করেন — যা জাতীয় উন্নয়নের সমন্বিত নীলনকশা।

সামাজিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন

খাল খনন কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, “গ্রাম সরকার” — এসব উদ্যোগে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

১৯৭৬–৭৮ সময়ে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৬.৪%, স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ।

তিনি বলেন—
“আমরা কারও দয়ায় টিকে থাকতে চাই না, আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চাই।”

 

পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

বাংলাদেশ গ্রহণ করে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়” নীতি।
তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মুসলিম বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করেন।
তাঁর উদ্যোগেই সার্ক-এর ভিত্তি তৈরি হয়।

শাহাদাত

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনা অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান দেশপ্রেমের শেষ প্রদীপ জ্বালিয়ে শহীদ হন।
তাঁকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।