বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি কেবল রাজনীতির মঞ্চেই নয়, জাতির চেতনায়, ইতিহাসের গভীরতম স্তরে, সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। যিনি আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতিমূর্তি, গণতন্ত্রের জন্য নিরন্তর সংগ্রামী, জনগণের অধিকার ও মর্যাদার প্রশেড়ব কখনো আপোষ করেননি- তিনি হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ অধ্যবসায়, এক অগিড়বপরীক্ষার পথচলা। বিপর্যয়, দমন, গৃহবন্দিত্ব, কারাবাস- কিছুই তাঁর বিশ্বাসকে নড়াতে পারেনি।
জীবনের সূচনা ছিল একেবারেই সাধারণ পরিবারের পরিমÐলে যেখানে শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা ছিল প্রধান শিক্ষার ভিত্তি।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্মনাম খালেদা খানম পুতুল। তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়, আর দুই ভাই ছিলেন সবার ছোট। তাঁর পিতামহ ছিলেন হাজী সালামত আলী এবং মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান।
খালেদা জিয়ার পিতা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন সৎ, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবান ব্যবসায়ী। তিনি মূলত ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ির সন্তান। ১৯১৯ সালে তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে জলপাইগুড়ি চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে বোনের বাড়িতে থেকে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন, পরে চা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে তিনি বেগম তৈয়বা মজুমদারকে বিয়ে করেন। জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তারা বসবাস করেন। ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর জনাব ইস্কান্দর মজুমদার মৃত্যুবরণ করেন।
খালেদা জিয়ার মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একান্তভাবে একজন গৃহিণী- মমতাময়ী, দৃঢ়চিত্ত ও নীরব অনুপ্রেরণা উৎস। তিনি সর্বদা পরিবারের স্নেহশীল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন।
শৈশবে খালেদা জিয়া ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি দিনাজপুরের মিশন স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়- তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে- যিনি পরে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির
প্রতিষ্ঠাতা।
বিয়ের পর তিনি “খালেদা জিয়া” বা “বেগম খালেদা জিয়া” নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যান। স্বামীর সঙ্গে তিনি পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান, যেখানে ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তাঁদের বসবাস ছিল। ১৯৬৯ সালের মার্চে তাঁরা ঢাকায় ফিরে আসেন, এরপর কিছুদিন জয়দেবপুরে এবং পরে জিয়াউর রহমানের কর্মস্থল চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় বসবাস করেন। তরুণ বয়সেই তিনি স্বামী ও সংসারকে কেন্দ্র করেই জীবনের সূচনা করেন। তবে ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় ইতিহাসের এক অমোঘ বাঁকে- যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির আশা ও সংগ্রামের প্রতীক।
১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে বেগম খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি।
এই সময় তিনি সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন; বিশ্বনেতা যেমন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, নেদারল্যান্ডসের রানী জুলিয়ানা প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর সৌম্য ব্যক্তিত্ব ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় পরিচিত করে তোলে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির কঠিন ও সংগ্রামী জীবন শুরু হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির সময় অতিক্রম করছিল। দলটি তখন ছিল অনেকটা নেতৃত্বশূন্য, বিভক্ত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায়। ঠিক এই কঠিন সময়েই- এক অবর্ণনীয় শোকের আবহে, এক তরুণ বিধবার দৃঢ় পদক্ষেপে শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তখন তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল শুন্য, কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল এক অদম্য মনোবল, সৎ উদ্দেশ্য, এবং শহীদ রাষ্ট্রপতির আদর্শের প্রতি গভীর বিশ্বাস। তিনি জানতেন, এই জাতি আবারও সংগঠিত হতে চায়, গণতন্ত্রের পথে ফিরতে চায়।
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে, তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণ, ত্যাগ, এবং দলের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে নিয়ে আসে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি নির্বাচিত হন দলের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে। এর অল্প সময় পর, ১৯৮৪ সালের আগস্টে, বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন বিএনপির চেয়ারপারসন অর্থাৎ দলের সর্বোচ্চ পদে।
এ ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, তখন তিনি ছিলেন এক তরুণ বিধবা নারী, যার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা প্রশাসনিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। কিন্তু তাঁর সাহস, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগের গুণাবলি তাঁকে দ্রæতই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
বেগম জিয়া ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি শোককে শক্তিতে পরিণত করতে জানতেন। তিনি রাজনীতিকে দেখেছিলেন দায়িত্ব হিসেবে- জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার অঙ্গীকার হিসেবে। তাঁর এই অটল বিশ্বাসই পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর জাতি যখন শোক ও বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল, তখন সুযোগ নেয় সামরিক বাহিনীর তৎকালীন প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে আরোপ করেন স্বৈরশাসন। গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও মুক্তচিন্তার পথ তখন বন্ধ হয়ে যায়।
এই দমননীতির বিরুদ্ধেই প্রথম দৃঢ় কণ্ঠে উঠে দাঁড়ান বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বুঝতে পারেন, শহীদ জিয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশ কখনো সামরিক শাসনের অধীনে টিকে থাকতে পারে না। তাই তিনি নেতৃত্ব দেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনে।
১৯৮৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া গঠন করেন সাতদলীয় জোট, যার নেতৃত্বে দেশজুড়ে শুরু হয় এরশাদের একনায়কতন্ত্রবিরোধী ব্যাপক গণআন্দোলন। জনগণের মধ্যে তখন একটাই স্লোগান “গণতন্ত্র চাই, স্বৈরাচার হটাও!” তিনি ছিলেন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, যাঁর নির্দেশেই রাজপথ উত্তাল হতো, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত প্রতিবাদের ঢেউ। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করলে বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন “স্বৈরাচারের নির্বাচনে অংশ নয়, প্রতিরোধই আমাদের পথ।” বিএনপি সেই নির্বাচন বর্জন করে, যদিও আওয়ামী লীগ, জাতীয় বেইমান জামায়াত ও কিছু বামদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এরশাদের শাসনকে বৈধতা দেয়। তবুও বেগম খালেদা জিয়া তাঁর অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি।
এই সময় তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গৃহবন্দিত্ব ও কারারুদ্ধ অবস্থার মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে তিনি সাতবার গ্রেফতার ও কারাবন্দী হন। কিন্তু তাঁর মুখে কখনো পরাজয়ের স্বর শোনা যায়নি। বরং তাঁর দৃঢ়তা ও আপসহীন মনোভাব তাঁকে দেয় ইতিহাসের অনন্য মর্যাদা “আপোষহীন নেত্রী” উপাধি।
শুধু রাজনীতির মূলধারাতেই নয়, তিনি নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন ছাত্ররাজনীতিতেও। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ছাত্রদল এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এর ফলেই দেশের ৩২১টি ছাত্র সংসদের মধ্যে ২৭০টিতে ছাত্রদলের জয়লাভ হয়, যা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্দোলনের প্রতিটি দিনই ছিল তাঁর জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল। জেল, নির্যাতন, হুমকি- কোনো কিছুই তাঁকে ভাঙতে পারেনি। অবশেষে দীর্ঘ নয় বছরের সংগ্রাম ও জনআন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রের রাণী।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের বিপুল সমর্থনে বিজয় লাভ করে। আর এর মধ্য দিয়েই ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়-বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
তিনি কেবল বাংলাদেশের নয়, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন, যা ছিল নারীর ক্ষমতায়নের পথে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল বাংলাদেশের সংবিধানে কাঠামোগত সংস্কার এনে রাষ্ট্রকে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর করা। ১৯৯১ সালের আগস্টে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি থেকে বাংলাদেশ আবার ফিরে আসে সংসদীয় ব্যবস্থায়, যেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাইৎ সরকারের নিয়ামক শক্তি। এটি ছিল স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
দেশনেত্রীর নেতৃত্বে দেশ প্রবেশ করে অর্থনৈতিক সংস্কারের নতুন যুগে। তাঁর সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। শিল্পোন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির নীতি গ্রহণ করা হয়। তাঁর শাসনামলে তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করে- এই খাতে কর্মসংস্থান ২৯% বৃদ্ধি পায়, যেখানে প্রায় দুই লক্ষ নারী প্রমবারের মতো কর্মজীবনে যুক্ত হন। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন রূপ দেয়।
দেশের মহাসড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিদ্যুতায়ন র্কাযক্রম স¤প্রসারিত হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মাধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণে সুবিধা তৈরি হয়। দেশের ভেতরে যেমন তিনি ছিলেন দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের নদী ও পানিসম্পদ রক্ষার প্রশ্নে সরব হয়ে গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যু উত্থাপন করেন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ন্যায্য চুক্তির দাবি জানান। ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যু তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার রক্ষার আহবান জানান। তাঁর উদ্যোগেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার শরণার্থী প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পাদিত হয়- যা মানবিক কূটনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
১৯৯৬ সালের শুরুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছিল তত্ত¡াবধায়ক সরকারের দাবিকে কেন্দ্র করে এক গভীর উত্তেজনা। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি তুললেও তখন সংবিধানে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই জটিল সময়েও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতান্ত্রিক ধৈর্য ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলার প্রতীক। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে তিনি এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন- মাত্র এক মাসের মাথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনঃনির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করেন। এই পদক্ষেপটি শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ইতিহাসেও এক বিরল উদাহরণ। ক্ষমতার প্রতি অনুরাগ নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রয়িার প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাসই এই সিদ্ধান্তকে অনন্য করেছে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সরকারে না ফিরলেও ১১৬টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলে পরিণত হয়।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট (বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাপা (নাজি.), ইসলামী ঐক্যজোট) বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে। এর মাধ্যমে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই মেয়াদে সর্বাধিক সময় দায়িত্ব পালনকারী নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই মেয়াদে তাঁর সরকার শিক্ষা, অবকাঠামো, অর্থনীতি, ও আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিতে এক ধারাবাহিক সাফল্যেও রূপকার হয়ে ওঠে।
বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষাকে দেখেছিলেন জাতির ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে। তাঁর আমলে গৃহীত নানা পদক্ষেপ বাংলাদেশে শিক্ষা বিস্তার ও নারীশিক্ষা আন্দোলনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করতে সরকার আইনগতভাবে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে।
মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা: এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এর ফলে মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির হার ৬২% থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮০%-এ।
উপবৃত্তি ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি: দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা যেন স্কুলে যেতে পারে সে লক্ষ্যে ‘ফুড ফর এডুকেশন’ ও ‘স্টাইপেন্ড ফর গার্লস’ প্রোগ্রাম চালু করা হয়, যা প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে সরাসরি সহায়তা দেয়।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছর বৃদ্ধি: এই পদক্ষেপ তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে, ফলে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষিত তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ: জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৫.৫% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেন।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হয় বহু যুগান্তকারী প্রকল্প যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় সংযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
গ্রামীণ যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প: ৩০,০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করে স্থানীয় বাজার ও কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সহজ করা হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩,৬০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে প্রায় ৪,৮০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। ৩২টি উপজেলায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হয়।
ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি: প্রায় ১৮ লাখ নারী ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় এসে ক্ষুদ্র ব্যবসা, পোলট্রি, ও হস্তশিল্পে সম্পৃক্ত হন।
তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কার: বেসরকারি খাতে মোবাইল ফোন লাইসেন্স প্রদান, ইন্টারনেট সার্ভিস সম্প্রসারণ ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার ভিত্তি স্থাপন করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদ ছিল বাংলাদেশের ক‚টনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার যুগ। তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। জাতিসংঘে জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমবাজারে অভিবাসী অধিকার, এবং নারী শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরেন। ২০০৫ সালে তিনি চীন, সৌদি আরব, ও মালয়েশিয়া সফর করে বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেন।
বেগম খালেদা জিয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন, ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (ACC) গঠন করেন। এ সময় বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ইউনিয়ন পরিষদে মহিলা সদস্য পদে সরাসরি নির্বাচনের বিধান কার্যকর হয়।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.৯% থেকে ৬.৭%-এ উন্নীত হয়, যা তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সেরা সাফল্য ছিল। এই সময়টিই বাংলাদেশের অবকাঠামো, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের “সোনালী অধ্যায়” হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক রাজনীতিক, যিনি কোনো আসনে কখনো পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনেই জয়লাভ করেন। এটি তাঁর অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তার প্রতিফলন।
২০০৭ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাতাসে পরিবর্তন আনে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সময় বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের উপর এক সুস্পষ্ট চাপ তৈরি হয়। সরকার দেশের রাজনৈতিক, বিচারবিভাগীয় ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানকে একদলীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
২০০৭ সালে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে গঠিত হয় একটি তথাকথিত ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষ’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার । ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া-কে সেনা-সমর্থিত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গ্রেফতার করে । এ গ্রেফতার ছিল সে সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি যুগান্তকারী ও সুপরিকল্পিত অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে নেতৃত্বহীন ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলা । ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকায় তার মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। একইসাথে আরাফাত রহমান কোকো-কেও গ্রেফতার করা হয়। তারেক রহমান পূর্বেই (৭ মার্চ ২০০৭) গ্রেফতার হন ।
১. বড়পুকুরয়িা কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কয়লা খনি লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার কওে দুর্নীতি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তদন্তে কোন সরাসরি আর্থিক অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। মামলাটি ছিল মিথ্যা, হয়রানীমূলক, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
২. Zia Orphanage Trust Case (জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলা): এই মামলায় অভিযোগ ছিল যে বিদেশ থেকে এতিমদের জন্য আসা অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই অনুদানের উৎস ছিল সৌদি রাজপরিবারের সদস্যের দেয়া একটি ট্রাস্ট তহবিল। টাকা সরাসরি ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল এবং সরকারি কোষাগারে না যাওয়াকে কেন্দ্র করেই অভিযোগ গঠন করা হয়।
৩. Zia Charitable Trust Case (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা): অভিযোগ ছিল, ট্রাস্টের নামে একটি অপ্রকাশ্য উৎস থেকে অনুদান নেয়া হয়েছে এবং তা আইনগত প্রক্রয়িা অনুসরণ করেনি।
মূলত: এই মামলা ছিল একেবারে টেকনিক্যাল ও অস্পষ্ট, যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।
খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের ফলে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। শীর্ষ নেতারা হয় গ্রেফতার হন, নয়তো আত্মগোপনে চলে যান। দলের তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দলীয় র্কাযক্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, সমাবেশ বা সভা নিষিদ্ধ ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপিকে ভাঙার জন্য “সংস্কারপন্থী” নামে একটি গোষ্ঠী তৈরি করে।
বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃত। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধি প্রদান করে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গণতান্ত্রিক দল, ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া তাঁকে ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে। গণতন্ত্র, নারী নেতৃত্ব, এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রধান প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতা ও আইনগত জটিলতার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া কখনো গণতন্ত্রের আদর্শেও সাথে আপোষ করেননি। তিনি আজও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক, নারী নেতৃত্বের উদাহরণ, ও রাজনৈতিক ধৈর্যের অবিস্মরণীয় চিহ্ন। বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন- তিনি এক প্রতীক, এক অধ্যবসায়ের নাম। বেগম খালেদা জিয়া মানেই সংগ্রাম, সাহস এবং আশার অন্য নাম। তাঁর জীবন সংগ্রাম বাংলাদেশের নারীর শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি। যে নারী সামরিক শাসন, কারাগার, মিথ্যা মামলা, নিপীড়ন সবকিছুর মধ্যেও আপোষ করেননি- তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।